ছবি - বিপ্রতীক২৪.কম ।
প্রবন্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাধক কবি রাধারমণ দত্ত

ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া ।।
ভ্রমর রে, কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণ হারা হইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।


বাংলাদেশের এই জনপ্রিয় গানটি শোনেননি,এমন কেউ নেই বললেই চলে। আর এই গানটি বিদেশী ভাষায় কিন্তু সেই একই সুরে গাওয়া হয়েছে। এই জনপ্রিয় এই গানটি সহ আরও জনপ্রিয় গান “কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া । অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া ।। “ “প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে” “আমারে আসিবার কথা কইয়া ,মান করে রাই, রইয়াছ ঘুমাইয়া”সহ বেশকিছু গানের মুল শিল্পী,সুরকার ও গিতিকার রাধারমন দত্ত।
রাধারমণ দত্ত, বা, রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ (১৮৩৩ – ১৯১৫) হলেন একজন বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈঞ্চব বাউল, ধামালি নৃত্য-এর প্রবর্তক। সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ এবং ভাইবে রাধারমণ বলেই সমাধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমণ দত্ত। তার রচিত ধামাইল গান সিলেট ও ভারতের বাঙ্গালীদের কাছে পরম আদরের ধন। রাধা রমন নিজের মেধা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ বিরহের আকূতি আর না-পাওয়ার ব্যাথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরণের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন।

  • জন্ম ও বংশ পরিচিতি

শ্রীহট্ট বা সিলেট অঞ্চলের পঞ্চখণ্ডে ত্রিপুরাধিপতি ‘ধর্ম ফাঁ’ কর্তৃক সপ্তম শতকে মিথিলা হতে আনিত প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে ‘আনন্দ শাস্ত্রী’ নামক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রাধারমণ দত্তের পুর্ব পুরুষ ছিলেন বলে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ঐতিহাসিক গ্রন্থ শ্রীহট্টের

ছবি - বিপ্রতীক২৪.কম ।
ছবি – বিপ্রতীক২৪.কম ।

ইতিবৃত্তে পাওয়া যায়। আনন্দ শাস্ত্রীর প্রৌপুত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারয়ন নামক ব্যক্তি তত্কালিন মণুকুল প্রদেশে “ইটা” নামক রাজ্যের স্থপতি। উক্ত ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারাণের এক পুত্র ছিলেন প্রভাকর। মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান দ্বারা ইটা রাজ্য অধিকৃত হলে, এই রাজ বংশের লোকগণ পালিয়ে গিয়ে আশে পাশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহন করেন। এ সময় প্রভাকর দত্ত তার পিতার সাথে আলিসারকুল চলে যান এবং সেখানে কিছু দিন বসবাস করার পর জগন্নাথপুর রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। কিছু দিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের তত্কালীন অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের নিকটস্থ কেশবপুর গ্রামে বাড়ী নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করেন। পরবর্তিতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র সম্ভুদাস দত্তকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। অতপর বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খা বা হবিব খার সাথে বিবাদে জগন্নাথপুর রাজ বংশের বিপর্য্যয়ের কারণ, রাজআশ্রীত কর্মচারীরাও দৈন্য দশায় পতিত হন । এ সময় সম্ভুদাস দত্তের পুত্র রাধামাদব দত্ত অন্যের দ্বারাস্থ না হয়ে, অনন্যচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গীত গোবিন্দ’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তার রচিত ভ্রমর গীতিকা, ভারত সাবিত্রী, সূর্যব্রত পাঁচালি, পদ্ম-পুরাণ ও কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য উল্লেখযোগ্য। এই প্রসিদ্ধ কবি রাধামাধব দত্তই ছিলেন রাধারমণ দত্তের পিতা। রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের জন্ম ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে (১২৪০ বঙ্গাব্দ)।

  • সাধনা ও বৈরাগ্য

কবি রাধারমণের পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপাসনার প্রধান অবলম্বন সংগীতের সংগে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই।খ্যাতিমান লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দ এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল। ১২৫০ বঙ্গাব্দে রাধারমণ পিতৃহারা হন এবং মা সুবর্ণা দেবীর কাছে বড় হতে থাকেন।কিশোর বয়স থেকে রাধরমণ সৃষ্টিত্বত্ত নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে মনোনিবেশে করেন।এজন্য তিনি বিভিন্ন সাধুসন্তের আদেশ উপদেশ অরে অরে পালন করতেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি মৌলভীবাজার এর ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর সাধন ভজনের কথা জ্ঞাত হয়ে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ গ্রহণ করেন। শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব মতবাদেও উপর ব্যাপক পড়াশুনা করেন। সবশেষে তিনি সহজিয়া মতে সাধন ভজন করেন। এজন্য তিনি বাড়ির পাশে নলুয়ার হাওরের একটি উন্মুক্ত স্থানে পর্ণকুঠির তৈরী করে সেখানে সাধন ভজন করতে থাকেন। তিনি কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা নিয়ে লোকগান রচনা করেন। তিনি ভজন সংগীতে বিভোর হয়ে গান রচানা করে নিজেই তা গাইতেন। তাঁর মুখের বাণীতে তাঁর শিষ্যগণ তা কাগজে লিখে রাখতেন। তাঁর নিজ হাতে রচিত গানের কোন পান্ডুলিপি নেই। কারণ তিনি তাৎনিকভাবে ভাবরসে বিভোর হয়ে গীতরচনা করতেন। কবি রাধারমণের পুরো পরিবারের পারিবারিক জীবন ধারায় বৈষ্ণব ও সুফীবাদেও প্রবল প্রভাব ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যেও ধারাবাহিকতায় উপসণার প্রধার অবলম্বন সংগীতের সংগে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দ এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল। রাধারমণ তাঁর শৈশব, কৈশর, যৌবন ও পরিণত বয়সে সে ধারাবাহিকতা তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
রাধারমন এঅঞ্চলের বিখ্যাত লোক কবি হাছন রাজা থেকে বয়সে প্রায় ১৪/১৫ বছরের বড় ছিলেন। তা সত্বেও তাদের মধ্যে খুব হৃদ্যতা ছিল। লোকমুখে কথিত আছে, হাছনরাজা রাধারমনকে তার সুনামগঞ্জের বাড়িতে দাওয়াত করে ছিলেন। লোককবিতার ভাষায় তিনি আহবান করেছিলেন ‘রাধারমন আছো কেমন, হাছন রাজা জানতে চায়।’ পত্র প্রাপ্তির পরে রাধারমন তার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্ততি নিয়েও কি একটা অসুবিধায় যেতে না পেরে লিখেছিলেন- ‘গানের সেরা রাজা হাছন, পেলাম না তার চরণ দর্শন, বিফলে দিন গেল গইয়া।’

  • সংসারজীবন

১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। কবির সংসারজীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় নি। শুধু জানা যায়, রাধারমণ-গুণময় দেবীর ৪ ছেলে ছিল। তাঁদের নাম- রাজবিহারী দত্ত, নদীয়াবিহারী দত্ত, রসিকবিহারী দত্ত ও বিপিনবিহারী দত্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় একমাত্র পুত্র বিপিনবিহারী দত্ত ছাড়া বাকি ৩ পুত্র এবং স্ত্রী গুণময় দেবী অকালে মারা যান। স্ত্রী ও পুত্রদের পরলোক গমনে কবি রাধারমণ দত্ত সংসারজীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। ১২৯০ বঙ্গাব্দে ৫০ বছর বয়সে কবি চলে যান মৌলভীবাজার জেলাধীন ঢেউপাশা গ্রামে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে।

  • রাধারমণের গীতি সংগ্রাহক

সিলেটের বাউল গানের সুরের দ্বারা যিনি মানুষের মনে ঠাইঁ করে নিয়ে ছিলেন তিনি হলেন রাধারমন। রাধারমনের গানের বেশ কিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়া গুরু সদয়দত্ত, ডঃ নির্মলেন্দু ভৌমিক,আব্দুল গফফার চৌধুরী, কেতকীরঞ্জন গুন,মুহাম্মদ আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, হুছন আলী, সৈয়দ মুরতাজা আলী, নরেশ চন্দ্র পাল, যামিনী কান্ত র্শমা, মুহম্মদ আসদ্দর আলী, মাহমুদা খাতুন, ডঃ বিজন বিহারী পুরকাস্থ, সৈয়দ মুস্তফা কামাল, মোঃ আজিজুল হক চুন্নু, জাহানারা খাতুন, নরেন্দ্র কুমার দত্ত চৌধুরী, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র

ছবি - বিপ্রতীক২৪.কম ।
ছবি – বিপ্রতীক২৪.কম ।

পাল, অধ্যাপক দেওয়ান মোঃ আজরফ ,শামসুর করিম কয়েস সহ আরও বিদগ্ধজন রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ কওে রেখেছেন। মুন্সী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতœ ‘রাধারমন সঙ্গীত‘ নামে ও সুনামগঞ্জের মরহুম আব্দুল হাই ‘ভাইবে রাধারমন বলে’ নামে বই প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত লোক তত্ত্ববিদ চৌধুরী গোলাম আকবর রাধারমনের প্রায় চল্লিশ বছরের সংগ্রহের গানগুলো নিয়ে সিলেট মদন মোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে তার তিন শতাধিক লোকগান স্থান পায়। রাধারমনের বেশ কিছু গান বাংলা একাডেমীর সংগ্রহেও রয়েছে।
বিভিন্ন সংগ্রাহকদের মতে, রাধারমন গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও উপরে। রাধারমন দত্ত একাধারে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, ও একজন ভাল চরিত্র অভিনেতা ছিলেন। রাধা রমন সম্পর্কে অনেক আলৌকিক কথাও লোকমুখে শোনা যায়। কথিত আছে, রাধারমন ভাবে কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে লোকগান রচনা করতেন। শিষ্যরা শুনে তা লিখে রাখতেন। তিনি তত্ত্ব সঙ্গীত, দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, বিরহ, ধামাইলসহ নানা ধরণের গান রচনা করেছেন। বাংলার গ্রামবাংলার বিয়েশাদীতে রাধারমনের ধামাইল গান খুব জনপ্রিয়। দুই বাংলার বেতার ও টেলিভিশনে রাধারমনের গান প্রায়স প্রচারিত হচ্ছে। ইদানিং বাংলা সিনেমাতে রাধারমনের বেশ কিছু গান সংযোজিত হয়েছে।
রাধারমন দত্তের সাধনা ছিল সহজিয়া বৈষ্ণবরীতির, সঙ্গীত ছিল তার সাধনার অন্তর্ভূক্ত একটি বিষয়। টানা ৩২ বছর তিনি ঈশ্বরের সাধনা করেছেন। রাধারমন দত্ত ৮২ বছর বয়সে ১৩২২ বাংলার ২৬ কার্তিক ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে শুক্রবার শুকাষষ্ঠি তিথিতে পরলোকে গমন করেন। জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। তারই শেষ স্মৃতি শ্মশান ঘাটটি বর্তমানে সমাধি ত্রে হিসাবে সংরতি রয়েছে। কেশরবপুর গ্রামের নরসিং মালাকারের স্ত্রী নিদুমনি দাস রাধারমনের সমাধিতে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সেবায়িতের কাজ করেছেন। আজ থেকে ৬ বছর আগে নিদু মালাকার মারা যান। বর্তমানে কেশবপুর গ্রামের রম্নু মালাকারের স্ত্রী অনিতা রাণী মালাকার রাধা রমন মন্দিরের দেখ ভালোর কাজ করছেন। কেশবপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী জৈনক ব্যাক্তি রাধারমন দত্তের সমাধিস্থল পাকা করে দেন। বিশ্বখ্যাত এ মরমী সাধক ও লোককবির সমাধিস্থল সংরণের জন্য আজ পর্যন্ত কোন প্রকার সরকারী উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

  • খাদেমুল বাসার ।
  • বিভাগ – প্রবন্ধ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ডেস্ক, বিপ্রতীক২৪.কম ।
Print Friendly




test