ছবি - সংগৃহীত
ফিচার

মাত্র পঞ্চাশটা টাকা আঁকড়ে ধরে রাখতে পেরেছিলেন বলেই….আজকের ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’।

সফল ক্যারিয়ার

ভীনদেশি সফল ব্যাক্তিদের সাফল্য-গাঁথার খবর শুনে আমরা আপ্লুত হই। অনুপ্রেরণা হিসেবে তাদের কথা আমরা বার বার স্মরণ করি। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের মতো বড় পর্যায়ে পৌঁছানো মুশকিল বলে মাঝে মধ্যে অভিযোগও করি। সাফল্য সার্বজনীন। পরিশ্রম চাবিকাঠি। কেউ পরিশ্রম এবং একাগ্রতা নিয়ে কাজ করলে যেকোনো অবস্থায় যেকোনো পরিস্থিতিতে শূন্য থেকে পূর্ণ হওয়া যে সম্ভব সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন অনেকেই। প্রচারের আলো না পাওয়া কিংবা স্বেচ্ছায় প্রচারবিমুখ এই মানুষগুলোর কথা জানেন খুব মানুষ-ই। বিপ্রতীক ২৪ নিউজ পাঠকদের জন্য এমনই এক উদ্যোক্তার গল্প নিয়ে হাজির আমরা……

জয়নাল আবেদীন পিতৃপ্রদত্ত নাম। বাড়ি ঢাকার অদূরে সাভারে। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জয়নাল ছিলেন সবচেয়ে ছোট। ছোট ছিলেন বলেই আদুরে ছিলেন সবার। দুরন্তপনায় তাই কমতি ছিল না। পড়ালেখাটা তার কাছে খুব পছন্দের বিষয় না। পছন্দ করার মতো ওই বয়সে আরো অনেক কিছুই উন্মুক্ত ছিল তার জন্য। তাই বলে ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে!
অবশ্য বিয়েটা যে খুব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটা করে অনেক ভেবে করেছেন তা নয়। ১২ বছর বয়সী যে কন্যাকে নিজের পরবর্তী জীবনের সঙ্গী বলে মেনে নিয়েছিলেন সেই মমতাজ বেগমকে বিয়ে করবার কথা ছিল জয়নালের বড় ভাইয়ের। বড় ভাইয়ের হটাৎ অমতে নিজেই এগিয়ে আসলেন সারাজীবন মতের মিল করে একসাথে থাকবেন বলে।
সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে’-কথাটা বোধহয় খুব একটা মিথ্যে না। কারণ সংসারে নতুন রমনী আসবার পরই তো হুট করে জয়নালের চিন্তায় পরিবর্তন হলো। এমনিতেই পড়ালেখায় খুব একটা মন বসে না। তাই ভাবলেন একটু ব্যবসায় বাণিজ্যে হাত পাকাবেন এবার। জয়নালের পরিবারের অতীত ইতিহাসেও রয়েছে ব্যবসায়ের প্রতি আলাদা একটা টান। তার মতে, তার পিতাই ছিলেন সেসময়ের প্রথম ব্যবসায়ী যিনি জলপথে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। ধান-চাল-চামড়াসহ নানানরকম পণ্য তিনি করাচি-মায়ানমার-মুম্বাই ইত্যাদি শহরে জলপথে আমদানি এবং রপ্তানির ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন।
এত অল্প বয়সে নতুন ব্যবসায় শুরু করবার জন্য পিতার দেখানো পথে হাঁটাই সবচেয়ে নিরাপদ হত জয়নালের জন্য। তিনি তা-ই করলেন। শুরু করলেন ধান-চালের ব্যবসায়। যাতায়াত ব্যবস্থার অবস্থা সুবিধের ছিলো না। তিন হাজার টাকা তখনকার দিনে অনেক টাকা। এই টাকা সম্বল করে তিনি ট্রেনে চেপে নওগাঁ যান। নওগাঁর প্রত্যন্ত কোনো গ্রাম থেকে কিনে নিয়ে আসতেন চাল। যদিও অনেকেই ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি। চালের ব্যবসায়ে জয়নাল ভালো করতে পারবেন না এমনটাও ঘোষণা দিয়েছিলেন কেউ কেউ।
এই সময় পূর্বপাকিস্থানে হটাৎ করেই শুরু হয় চালের আকাল। জয়নাল আবেদীন ভাবলেন এটাই সুযোগ। যশোর থেকে তিনি একাই আড়াইশ মন চাল কিনে ফেললেন বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে। তবে উপরওয়ালার নিশ্চয়ই ভিন্ন এক ভাবনা ছিল জয়নালকে নিয়ে। জয়নালের চাল-বোঝাই নৌকা ডুবে যায় মুন্সীগঞ্জের পদ্মার বুকে। হাতের মুঠোয় কোনোরকমে মাত্র পঞ্চাশটা টাকা আঁকড়ে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। বাদ বাকি সব নিয়ে যায় পদ্মায়। বাড়ি ফিরেই সিদ্ধান্ত-নাহ ধান চালের ব্যবসায় আর নয়!
এরই মধ্যে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। একটি নতুন দেশ-স্বাধীন বাংলাদেশ হলো। এর পর কন্ট্রাক্ট এর ব্যবসায় শুরু করলেন জয়নাল। বর্তমান মানিক মিয়া এভিনিউ, সংসদ ভবন অঞ্চল তখন নিতান্তই চাষাবাদের ক্ষেত! সেই বোরো ক্ষেতে কন্ট্রাক্টে মাটি ফেলার দায়িত্ব নেন জয়নাল। নিজের কাজের সুবিধের জন্যেই কিনে নেন একটি ট্রাক। মুল্য ১৪ হাজার টাকা।
ট্রাকের চাকায় জীবন বদলাতে শুরু করে জয়নালের। কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটা ট্রাক ভাড়াও নেন। কিছুদিন পর অবশ্য তার খরিদ করা প্রথম ট্রাক বিক্রি করে দিয়ে নিয়ে নেন পাঁচ-টনি বিশাল ডিজেলচালিত ট্রাক। এই সময় ফেনীতে নদীর বাঁধ নির্মাণের কাজ পান। এই কাজের জন্য অগ্রিম তাকে দেওয়া হয়েছিল ১০ লাখ টাকা। সুযোগ-সন্ধানী ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন বিনিয়োগের দিকে চোখ রাখেন। ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টি দিয়ে লাভ-ক্ষতি বুঝে ফেলার এক আশ্বর্য ক্ষমতাই নির্ধারণ করে কেউ ব্যবসায় সফল হবেন কী ব্যর্থ হবেন! জয়নালের সে চোখ ভুল দেখেনি। পরিবহন ব্যবস্থার দুরবস্থার দিনে তিনি প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে কিনে ফেললেন দুইটি বাস-হিনো কোচ।
জয়নালের বাস প্রথম সার্ভিস দেয় ঢাকা-বগুড়া রুটে। বাসের নাম দিয়েছিলেনহানিফ এন্টারপ্রাইজ। জয়নালের ছোট ছেলে হানিফের নাম অনুসারেই কোম্পানির নাম দিয়েছিলেন। নামের জ্যোতি ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশ-জুড়ে তেমনি ছড়িয়ে পড়েছে বাসের রুট। দেশের বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলাসমূহের রাজপথে নিয়মিত উড়তে থাকে হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাস। চার দশকে তিলে তিলে বড় করা এই বাস কোম্পানির বহরে যুক্ত আছে এখন প্রায় ১ হাজার ২ শ বাস! হানিফ বাসের চাকায় এখন অগণিত বেকার যুবকের ভাগ্যও ঘুরছে। এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ে চাকুরিরত আছেন কয়েক হাজার কর্মী-কর্মকর্তা ।
এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার সাথে শহরের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন জয়নাল আবেদীন তার স্বপ্নের হানিফ এন্টারপ্রাইজএর মাধ্যমে। অনেকে তাকে একারনে ফাদার অব ট্রান্সপোর্টেশনও বলে থাকেন। গণপরিবহনের ফাদার জয়নাল আবেদীন অবশ্য থাকতে চান প্রচার বিমুখ হয়েই। হয়ত কথা কম বলে কাজ বেশি করেন বলেই সেদিনের হাতের মুঠোয় পঞ্চাশ টাকা নিয়ে বেঁচে ফেরা মানুষটিই আজকে হানিফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জয়নাল আবেদীন-যার আবেদনময়ী সাফল্যে নিশ্চয়ই অনুপ্রাণিত হবে নতুন প্রজন্মের অন্য কোনো জয়নাল!

সমন্বয়ক – এ কে এম তুষার

তথ্যঋণ : কালের কণ্ঠ, বণিক বার্তা, সামহোয়্যার ইন ব্লগ

 

Print Friendly




test