Padma_River
ফিচার

দয়া করে নদীগুলোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দিন!

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও নদ-নদী ও খাল-বিলগুলো আর আগের অবস্থায় নেই। একদিকে দূষণ, অন্যদিকে দখলদারিত্ব বিষিয়ে তুলেছে নদীর জীবন। পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য পড়েছে হুমকির মুখে। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক চলাচল। দেখলে মনে হয় নদীগুলো যেন শিল্প কারখানার বজ্রের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কারখানার আবর্জণা তো আছেই, তার সঙ্গে স্যুয়ারেজ লাইনের দূষিত পানি, বাসা-বাড়ির নিত্যদিনের ময়লা, কেমিক্যাল পদার্থ, পলিথিন, হাসপাতাল বর্জ্য মিশে একাকার হয়েছে নদীর পানিতে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতা আর অব্যবস্থাপনায় পদ্মা- বুড়িগঙ্গার মতো বড় বড় নদী আজ মৃতপ্রায়। নিয়মিত ড্রেজিং না করায় নদীতে জেগে উঠছে অসংখ্য চর, যা নদী দখলে প্রভাবশালী মহলে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ডেভলপার কোম্পানিগুলো ডিজিটাল সাইনবোর্ড টানিয়ে নদী পাড়কে বলছে মডেল টাউন। আর নিত্যদিন ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তুলছে অবৈধ সব স্থাপনা। আবর্জনা দিয়ে ভরাট করা এসব জায়গায় তারা বড় বড় বিল্ডিং, অট্টালিকা তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসে বাধ্য করছে মানুষকে। যার ফলাফল আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্বল্প-মাত্রাতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি, ভূমিকম্পে স্থাপনাগুলোর দৈন্যদশা ।

একসময় যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থায় নৌপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কিন’ নাব্যতা কমে যাওয়ায় সংকুচিত হয়েছে নৌপথের ব্যবহার। ফলে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে রেল, সড়ক ও আকাশ পথের ওপর। আকাশ পথে কম হলেও সড়ক ও রেলপথে অতিরিক্ত যাতায়াতের কারণে বর্তমানে এ দুই যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। যার ফলে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, ভ্রমণে লাগছে দ্বিগুণ সময়, প্রতিদিন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মেধাবী মানুষ। একটি বেসরকারী সমীক্ষায় জানা যায়, ১৯৬১ সালে নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। গত ৫১ বছরে দেশের ২২ হাজার ২শ’ কিলোমিটার নদীপথ হারিয়ে গেছে। ভারত অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার, অপরিকল্পিত নদীশাসন, অবৈধ দখলদারদের ভরাট ও নদী ড্রেজিংয়ে অবহেলার কারণে নদীপথ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সেইসাথে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দেশ স্বাধীনতার পর নতুন করে আবারও নদীপথের জরিপ কাজ পরিচালনা করা হয়। সে সময় ১২ হাজার কিলোমিটার নদীপথের হদিস মেলে। নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ১৯৮৯ সালে আবারও নদীপথের ওপর জরিপ কাজ পরিচালনা করে সরকার। তখন নদীপথ পাওয়া যায় ছয় হাজার কিলোমিটার। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিস্নউটিএ) হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে নৌচলাচলের উপযোগী নৌপথ আছে মাত্র এক হাজার ৮শ’ কিলোমিটার। সূত্র জানায়, ১৯৭২ সালে বিআইডব্লিউটিএ’র নদী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে জনবল, সরঞ্জাম ও বরাদ্দ ছিল এখনো তার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। কোন সরকারই নদীপথ সংস্কারে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র দুই ভাগ এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বরাদ্দ দিয়ে কিছুই করতে পারে না বিআইডব্লিউটিএ। তাদের মতে, এডিপির ১০ ভাগ বরাদ্দ রাখা হলে ছয় হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় বিআইডব্লিউউটিএ’র কিছু করার থাকবে না। নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞরা ১৯৮৯ সালের জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২৪ হাজার নদীপথের সবটুকু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যদি ছয় হাজার কিলোমিটার নদীপথও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় তাহলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে। এ নৌপথটুকুও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজানে ভারত অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার, অপরিকল্পিতভাবে নদীশাসন, উজানে বৃক্ষনিধন, অতিরিক্ত জমি কর্ষণ, নগরায়ন এবং অতিবর্ষণে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে নিরন্তর। সে কারণে বর্ষায় অতিরিক্ত পলি আসে। এ পলি সমুদ্রে যাওয়ার কথা থাকলেও উপসাগরীয় স্রোত এবং জোয়ার তা আবার উজানে ঠেলে দেয়। জোয়ারের সময় পানি শান্ত থাকায় এ পলি জমা হয় নদীবক্ষে। পানি নামার সময় স্রোতের বেগ তুলনামূলক কম থাকায় পলি কেটে সমুদ্রে নিতে পারে না। এসব কারণে নদ-নদীর নাব্য হ্রাস পাচ্ছে। সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে দেশের নদীপথ।

 

লেখকঃ সম্পাদক-প্রকাশক সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ পত্রিকা কুষ্টিয়া।

(বিপ্রতীক কার্টুন ট্যাবলয়েড এ প্রকাশিত)

Print Friendly




test