গুম, মানবাধিকার ও আমাদের বাংলাদেশ
ফিচার

গুম, মানবাধিকার ও আমাদের বাংলাদেশ

Print Friendly

আমাদের দেশে গুমের ঘটনা নতুন কিছই নয়। অতি পুরাতন একটি শব্দ। স্বাধীন বাংলাদেশে ৪২ বছর ধরে এ জঘন্যতম ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় জোরপূর্বক নিরুদ্দেশকরণ তথা গুমের ঘটনা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় ২২ জন গুম হয়েছেন। এছাড়া গত ২৭ মাসে বাংলাদেশে ১০০ মানুষ গুম হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে বড় অংশ বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, শ্রমিক সংগঠনের নেতা, ব্যবসায়ীও রয়েছেন। অনেকেরই ক্ষত-বিক্ষত লাশ পথে-ঘাঠে, ঢাকার আশপাশের নদী শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গাসহ দেশের অন্যান্য নদীতে পাওয়া গেছে। আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর হিসাবমতে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০।

চারপাশে এমন সব দেখে ও পড়ে আজ আমার কবি জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত কবিতাটি পড়তে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে। ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তাঁরা; যাদের হৃদয়ে প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী আজ অচল তাদের সুপরামর্শ ছাড়া/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/ এখন যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’

আমি লেখালেখী করি বলে আমার কিছু প্রবাসী বন্ধু গুম বিষয়ে লেখার জন্য আমার মেইলে বেশ কিছু চিঠি পাঠিয়েছে। এরপর গুম সম্পর্কে ভালভাবে জানতে আমি পড়াশুনায় মনোযোগী হই। গুম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ বাংলা একাডেমীর বাংলা-ইংরেজি  অভিধানে লেখা আছে- কিডনাফড। ইংরেজি যে প্রতিশব্দ দেওয়া হয়েছে সে প্রতিশব্দের সাথে ব্যবহারিক  শব্দের বেশ ফারাক। কারণ  কিডন্যাপ শব্দের অর্থ অপহরণ। বাংলাদেশের আইনে অপহরণের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এরকম যে, দন্ডবিধির ৩৬২ ধারা মতে- যে ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তিকে কোন স্থান হতে গমন করার জন্য জোরপূর্বক বাধ্য করে বা কোন প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুব্ধ করে, সেই ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অপহরণ করেছে বলে গণ্য হবে।

জাতিসংঘের একটি কনভেনশন আছে। সেই কনভেনশনে মানব-গুমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘রাষ্ট্র  অথবা রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত এজেন্ট, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে/সম্মতিক্রমে সংগঠিত গ্রেপ্তার, আটকাদেশ, অপহরণ বা অন্য কোনো ধরনের অধিকারহরণ যার মধ্যে আটকাবস্থার কথা অস্বীকার, সর্বশেষ অবস্থান বা ভাগ্য সম্পর্কে জানতে না দেওয়া যার মাধ্যমে আইনের আশ্রয় লাভ থেকে বঞ্চিত করা।”

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকার যে ‘দিনবদল’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল; সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে মনে হয়, দিনবদল হয়েছে ঠিকই, তবে সাধারণ মানুষের নয়। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদের ভাষায়, ‘মানুষ ঘরে থাকলে খুন হয়, বাইরে গেলে গুম হয়’। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে তৈরি সরকারের বিশেষ বাহিনী র‌্যাবের ক্রসফায়ারে এ যাবৎ হাজার দেড়েক মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। এই নির্মম, নিষ্ঠুর, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজে মানুষের মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

গত এক মাসের পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর দেখে মনে হয়েছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি এখন মৃত্যু উপত্যকা। মহাজোট সরকারের সদ্য সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএসের টাকা কেলেঙ্কারি ফাঁসের নায়ক ড্রাইভার আজম নিখোঁজ, ইলিয়াস আলীর সঙ্গে তার ড্রাইভার আনসার আলীও গুমের শিকার, হরতালের আগের দিন মধ্যাহ্নের আহার শেষে ক্লান্ত ঘুমন্ত চালক বদর আলী অগ্নিদগ্ধ হয়ে ছাই, পিকেটারদের হামলায় নিহত রংপুরের গাড়িচালক আব্দুর রশীদ, ইলিয়াস আলী গুমের প্রতিবাদে সংঘর্ষে তার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের বিশ্বনাথে পুলিশ ও সরকারি দল সমর্থকদের হামলায় নিহত মনোয়ার হোসেন, জাকির হোসেন ও আরও একজনের লাশ, সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হওয়া হযরত আলীর লাশ বলে দেয় সত্যিই এই দেশ এখন মৃত্যু উপত্যকা।

তারপরও শাসকশ্রেণী বলছে, দেশ ভালো আছে। বিরোধী দল লাগাতার সংসদ বর্জন করলেও আমাদের গণতন্ত্র সুসংহত; এগোচ্ছে। শেয়ার মার্কেট ও এমএলএম, ডেসটিনিসহ আরও নানা ছদ্মখাতের মাধ্যমে সরকারের প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে লোপাট হয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সাংসদ, মন্ত্রী মহোদয়, এপিএস ও তাদের নানা বন্ধনে আবদ্ধ স্বজনদের বায়বীয় দুর্নীতির কথা না হয় না-ই বললাম। নিজের জীবনের সবটুকু সঞ্চয় বিনিয়োগে খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে গেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। দেশে এত সব ঘনঘটার পরও যখন রাষ্ট্রের বিবেক বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী শাসকদের মনতুষ্টিতে নির্লজ্জ তোষামোদে মেতে ওঠেন, তাহলে প্রান্তিক মানুষদের আরও বিড়ম্বনা-গঞ্জনা-বঞ্চনা; আরও ধ্বংস, বিনাশ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে পাঠকই তার জবাব দিবেন।

লেখকঃ সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক কুষ্টিয়া।

(বিপ্রতীক কার্টুন ট্যাবলয়েড এ প্রকাশিত)

test